Tuesday, June 25, 2024

কর্মধারয় সমাস

যে সমাসে পূর্বপদটি পরপদের বিশেষণ রূপে অবস্থান করে এবং পরপদের অর্থই কার্যকরী থাকে তাকে কর্মধারয় সমাস বা Appositional Determinatives বলে। কর্মধারয় শব্দের অর্থ বৃত্তি ধারণকারী। বিশেষণ ও বিশেষ্য, বিশেষ্য ও বিশেষণ, বিশেষণ ও বিশেষণ এবং বিশেষ্য ও বিশেষ্য- এই রকম সম্পর্ক নিয়ে কর্মধারয় সমাস হয়।

বিশেষণ ও বিশেষ্য (পূর্বপদ বিশেষণ ও পরপদ বিশেষ্য)
কাল যে পেঁচা-কালপেঁচা গুণী যে জন-গুণীজন
নীল যে মানিক-নীলমানিক হেড যে মাস্টার-হেডমাস্টার
লার যে টুপি-লালটুপি ভাঙা যে হাট-ভাঙাহাট
পূর্ব যে রাত্র-পূর্বরাত্র সতী যে রমণী-সতীরমণী
নব যে পল্লব-নবপল্লব দুষ্ট যে মতি-দুষ্টমতি
শ্বেত যে বস্ত্র-শ্বেতবস্ত্র নীল যে উৎপল-নীলোৎপল
সৎ যে কর্ম-সৎকর্ম মধুর যে বচন-মধুরবচন

অনুরূপ: পুণ্যভূমি, পুণ্যদিন, মহর্ষি, মোহনভোগ, মহাজন, পূর্বাহ্ন, অপরাহ্ন, ভাল মানুষ, প্রিয়পাত্র, নবজাতক, বড়লাট, গতকাল, শ্বেতপদ্ম, খোদমেজাজ, দীর্ঘায়ু, খাসমহল ইত্যাদি।

বিশেষণ ও বিশেষণ (পূর্বপদ ও পরপদ উভয়ই বিশেষণ হয়)
যেমন-
যে চালাক সে চতুর-চালাকচতুর যা টাটকা তা ভাজা-টাটকা ভাজা
যা কাঁচা তাই মিঠা-কাঁচামিঠা সাড়ে এর সাথে পাঁচ-সাড়েপাঁচ
যা বিরাট তা বিশাল-বিরাটবিশাল যা লাল তা কালো-লালকালো
মধুর অথচ ভীষণ- মধুরভীষণ যেমন হিংস্র তেমন কুটিল-হিংস্রকুটিল
কঠিন অথচ কোমল-কঠিনকোমল

বিশেষ্য ও বিশেষ্য
যেমন-
যিনি ঠাকুর তিনি দাদা-ঠাকুরদাদা যিনি খোকা তিনি বাবু-খোকাবাবু
যিনি খাঁ তিনি সাহেব-খাঁ সাহেব যিনি পিতা তিনি দেব-পিতৃদবে
যিনি মৌলবী তিনি সাহেব-মৌলবী সাহেব যিনি গঙ্গা তিনি নদী-গঙ্গানদী বা গঙ্গা নামের নদী

অনুরূপ: অশোকপুষ্প, আকাশমন্ডল, ললাটভাগ, তমাললতা, পন্ডিতজন, ঢাকানগরী, দাদাভাই, শুকতারা ইত্যাদি।

মধ্যপদলোপী কর্মধারয়: যেখানে কর্মধারয় সমাসে ব্যাসবাক্যের মধ্যে অবস্থিত ব্যাখ্যামূলক পদের লোপ পায় তাকে মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস বলে। উদাহরণ-
ঘি মেশানো ভাত-ঘিভাত স্বর্ণের ন্যায় উজ্জ্বল অক্ষর-স্বর্ণাক্ষর
দুধ মিশ্রিত সাগু-দুঘসাগু পদ্ম সদৃশ আঁখি-পদ্ম-আঁখি
তেল মাখার ধুতি-তেলধুতি সিঁদুর রাখার কৌটা-সিঁদুরকৌটা
ঘৃত মিশ্রিত অন্ন-ঘৃতান্ন শিক্ষা বিষয়ক মন্ত্রী-শিক্ষামন্ত্রী
পল সহযোগে অন্ন-পলান্ন খাদ্য বিষয়ক মন্ত্রণালয়-খাদ্যমন্ত্রণালয়
অষ্ট অধিক দশ-অষ্টাধিক পদার্থ বিষয়ক বিদ্যা-পদার্থবিদ্যা

অনুরূপ: উটপাখি, মানিব্যাগ, ষোড়শ, ভিক্ষান্ন, চিকিৎসাশাস্ত্র, ভাষাতত্ত্ব, জয়পতাকা, মোটরগাড়ি, সিংহাসন, একাদশ, দ্বাদশ।

তুলনা বা উপমা করে কর্মধারয় সমাস হয়: এর তিনটি ভাগ রয়েছে। একে তুলনাবাচক কর্মধারয় সমাস বলা যেতে পারে।

এগুলো হলো- ক. উপমান কর্মধারয় খ. উপমিত কর্মধারয় ও গ. রূপক কর্মধারয়। এই তিন প্রকার সমাসে তিনটি উপাদান থাকে- (ক) উপমান (খ) উপমেয় (গ) সাদৃশ্যবাচক শব্দ।

উপমান: যার সাথে তুলনা করা হয় তাকে উপমান বলে। চাঁদের মতো মুখ-চাঁদমুখ। এই ব্যাসবাক্যে চাঁদের মাসে মুখের তুলনা করা হয়। এখানে চাঁদ উপমান।

উপমেয়: যাকে তুলনা করা হয় তাকে উপমেয় বলে। ওপরের ব্যাসবাক্যে মুখ উপমেয়।

সাদৃশ্যবাচক ও বা তুলনাবাচক শব্দ: ওপরের ব্যাসবাক্যে ‘মতো’ হল সাদৃশ্যবাচক বা তুলনাবাচক শব্দ। অনুরূপভাবে ন্যায়, সদৃশ্য ইত্যাদি শব্দও ব্যবহার করা হয়।

উপমিত কর্মধারয়: পূর্বেপদে উপমান ও পরপদে উপমিত মিলে যে সমাস হয় তাকে উপমিত কর্মধারয় বলে। এখানে উপমান ও উপমেয় দুটোই বিশেষ্য পদের হয়। যেমন-
সোনার মতো মুখ- সোনামুখ (বিশেষ্য+বিশেষ্য)
পদ্মের ন্যায় মুখ-পদ্মমুখ
সিংহের ন্যায় নর-নরসিংহ
কমলের ন্যায় নয়ন-নয়নকমল
চাঁদের ন্যায় বদন-চাঁদবদন

অনুরূপ: অধরপল্লব, চরণকমল, বীরসিংহ, ফুলঝুরি, পুরুষ ব্যাঘ্র, রাজর্ষি, পুঙ্গব, করপল্লব।

উপমান কর্মধারয়: পূর্বপদে উপমান ও পরপদে সাধারণ গুণবাচক বিশেষণ মিলে যে সমাস হয় তাকে উপমান কর্মধারয় সমাস বলে। এক্ষেত্রে বিশেষ্য ও বিশেষণের মধ্য সমাস হয়। যেমন-
কুসুমের ন্যায় কোমল-কুসুমকোমল (বিশেষ্য+বিশেষণ)
শশকের ন্যায় ব্যস্ত-শশব্যস্ত তুষারের ন্যায় ধবল-তুষারধবল
বরফের মত সাদা-বরফসাদা মিশির ন্যায় কালো-মিশকালো
লৌহের ন্যায় কঠিন-লৌহকঠিন গোলাপের মত লাল-গোলাপলাল
কুসুমের মত পেলব-কুসুমপেলব সিঁদুরের মত লাল-সিঁদুরলাল

আরো উদাহরণ: শৈলোন্নত, দূর্বাদলশ্যাম, ঘনশ্যাম (ঘন অর্থ মেঘ), গোবেচারা, হিমশীতল ইত্যাদি।

রূপক সমাস: পূর্বপদে উপমেয় ও পরপদে উপমানের (বিশেষ্য+বিশেষ্য- মধ্যে অভেদ কল্পনা করে যে সমাস হয় তাকে রূপক সমাস বলে। যেমন- কাল রূপ রাত্রি-কালরাত্রি। এখানে উপমান ও উপমেয়র সম্পর্ক অভেদ বা অভিন্ন মনে হয়। ‘কাল’ এখানে উপমেয় এবং ‘রাত’ উপমান। যেমন-
জ্ঞান রূপ আলোক-জ্ঞানালোক বিরূহ রূপ সাগর-বিরূহসাগর
ভব রূপ নদী-ভবনদী আঁখি রূপ পাখি-আঁখিপাখি
মন রূপ মাঝি-মনমাঝি চাঁদ রূপ বদন-চাঁদবদন
বিদ্যা রূপ ধন-বিদ্যাধন ক্ষুধা রূপ অনল-ক্ষুধানল

এরকম: কালচক্র, জীবনপ্রবাহ, শোকসাগর, দেশমাতৃকা, প্রাণপাখি, বিষাদসিন্ধু, শোকসিন্ধু, দেশমাতৃকা, সংসার সমুদ্র, মোহনিদ্রা ইত্যাদি।

তথ্যসূত্র: পুরাতন বইয়ের দোকান/লাইব্রেরি হতে বিভিন্ন লেখকের বাংলা ব্যাকরণ বই সংগ্রহ করে তা এখানে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

Related Articles

Latest Articles